শিশুর হাঁপানির মারাত্মক লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়

বুকের ভেতর শো শো শব্দ হয়। সঙ্গে ঘন ঘন শুষ্ক কাশি হাঁপানির অন্যতম লক্ষণ। এ ছাড়াও গলার নিচের অংশ ও দুই পাঁজরের নিচে ও মধ্যবর্তী অংশ শ্বাস নেওয়ার সময় ভেতরে ঢুকে যায়। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না শিশু।
শিশুর হাঁপানির মারাত্মক লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়

হাঁপানি একটি প্রদাহজনিত সমস্যা হিসেবে পরিচিত। আর এই সমস্যা বার বার দেখা দেয়। কিছু উদ্দীপক পদার্থ শ্বাসনালিতে প্রদাহের সৃষ্টি করে থাকে। আর শ্বাসনালি সরু হয়ে যায়। এর ফলে শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। 

হাঁপানি উদ্দীপকের মধ্যে আছে ধোঁয়া, সুগন্ধী, পরাগ রেণু, মাটি, ধূলিকণা এবং ভাইরাল সংক্রমণ জিনিস। 

সোঁ সোঁ আওয়াজ, শ্লেষ্মা, হাঁফ ধরা, বুকে চাপ ধরা এবং শ্বাস কষ্ট হাঁপানির অন্যতম লক্ষণ। 

রোগ নির্ণয় করা হয় বাচ্চার সোঁ সোঁ আওয়াজ দেখে এবং হাঁপানির পারিবারিক ইতিহাস থেকে। 

দেখা যায় বেশির ভাগ বাচ্চা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা কাটিয়ে ওঠে। 

উদ্দীপকগুলিকে এড়ানো গেলে এই হাঁপানি আটকানো যায়। 

হাঁপানি যে কোনও বয়সেই হতে পার। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি সাধারণত জন্মের প্রথম ৫ বছরের মধ্যেই  দেখা দিতে পারে। আবার, কিছু কিছু বাচ্চার বড় বয়সেও হাঁপানি থেকে যেতে পারে। অন্য বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই হাঁপানি সেরে যায়। এই দশকে হাঁপানি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে এবং এই রোগটি কার্যত সাধারণ খুবই ব্যাপার হয়ে গেছে। শহরের বাচ্চাদের মধ্যে আক্রান্তের হার ২৫% থেকে ৪০% পর্যন্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুকে  হাঁপানির জন্যই  হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় এবং এর জন্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির পয়লা নম্বর কারণ। 

এক মাত্র বাড়াবাড়ির সময় ছাড়া হাঁপানি নিয়েও বেশির ভাগ বাচ্চাই স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করতে পারে। অল্প কিছু সংখ্যক বাচ্চার মাঝারি থেকে সাঙ্ঘাতিক রকমের হাঁপানি হয় এবং তাদের খেলাধূলা ও স্বাভাবিক কাজকর্ম করার জন্য প্রতি দিন প্রতিষেধক ওষুধ নেওয়ার দরকার হয়ে থাকে। আবার, হাঁপানি আছে এমন বাচ্চারা কিছু উদ্দীপকের ক্ষেত্রে যে সাড়া দেয়, হাঁপানি নেই এমন বাচ্চারা সেই সাড়া দেয় না। আর এর কারণ জানা যায় না। 

শিশুর হাঁপানির কারণ 

হাঁপানি ঘটায় এমন বহু উদ্দীপক পদার্থ রয়েছে। তবে দেখা যায় বাচ্চারা তার অল্প কিছুতেই সাড়া দেয়। কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট উদ্দীপক পদার্থ কেন হাঁপানি বাড়িয়ে দেয় তার কারণ এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। আর এই সমস্ত উদ্দীপক পদার্থ একই ভাবে কাজ করে। শ্বাসনালিতে কিছু কোষ রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে থাকে। এই পদার্থগুলি সাধারনত শ্বাসনালিতে প্রদাহের সৃষ্টি করে, ফুলিয়ে দেয় এবং শ্বাসনালির দেওয়ালের পেশি কোষগুলিকে উদ্দীপিত করে তাদের সঙ্কোচন ঘটায়।এই রাসায়নিক পদার্থগুলি দ্বারা ক্রমাগত উদ্দীপনার ফলে শ্বাসনালিতে বেশি মাত্রায় মিউকাস তৈরি হয়, শ্বাসনালির পর্দার কোষগুলির বিমোচন ঘটে এবং এর দেওয়ালের পেশি কোষগুলি বড় হয়ে যায়।আর  শ্বাসনালির হঠাৎ সরু হয়ে যাওয়ার (হাঁপানির টান) পেছনে এই ধরণের প্রতিটি ঘটনার হাত আছে। বেশির ভাগ বাচ্চাদের দেখা যায় শ্বাসনাল দু’টি টানের মাঝে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। 

শিশুর হাঁপানির লক্ষণ 

হাঁপানির টানে যেহেতু শ্বাসনালি সরু হয়ে যায়, বাচ্চার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, বুকে চাপ ধরে ও কাশি হয়, সঙ্গে অদ্ভুত একটা সোঁ সোঁ আওয়াজ হয়ে থাকে। 

সোঁ সোঁ আওয়াজ তীব্র কম্পাঙ্ক যুক্ত একটি আওয়াজ, যেটা কিনা বাচ্চার শ্বাস নেওয়ার সময় শোনা যায়। 

যদিও সমস্ত হাঁপানির টানেই এমন সোঁ সোঁ আওয়াজ হয় না। অল্প হাঁপানি, বিশেষত কমবয়সি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র কাশির সৃষ্টি হতে পারে। বেশি বয়সের বাচ্চাদের যাদের অল্প হাঁপানি আছে, তাদের কাশি হতে পারে শুধুমাত্র ব্যায়াম করলে অথবা ঠান্ডা হাওয়ার সংস্পর্শে এলে এমন হয়। আবার, মারাত্মক রকমের হাঁপানি আছে এ রকম বাচ্চাদেরও সোঁ সোঁ আওয়াজ না-ও হতে পারে কারণ শ্বাসনালি দিয়ে  বাতাস বের হওয়ার আওয়াজ করার পক্ষে কম হয়। আর খুব বাড়াবাড়ি রকম টানের ক্ষেত্রে শ্বাস নেওয়া দৃশ্যতই খুব কষ্টকর হয়ে ওঠে। 

সোঁ সোঁ আওয়াজ জোরে হতে থাকে, বাচ্চা খুব তাড়াতাড়ি এবং জোর দিয়ে শ্বাস টানতে থাকে এবং যখন বাচ্চা শ্বাস টানে (প্রশ্বাসের সময়ে), বুকের পাঁজরগুলি যেন বেরিয়ে আসে এমন দেখতে হয়। 

আবার, খুব সাঙ্ঘাতিক রকম টানের সময়ে, বাচ্চা শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে এবং সামনের দিকে ঝুঁকে সোজা হয়ে বসে। চামড়া ঘর্মাক্ত হয় এবং পাণ্ডুর বাঁ নীলচে হয়ে যায়। 6.আবার দেখা যায়, যে সব বাচ্চার ঘন ঘন খুব বাড়াবাড়ি রকমের টান হয়, তাদের কখনও কখনও বৃদ্ধি ধীর হয়। কিন্তু সাধারণত বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বৃদ্ধি অন্যান্য বাচ্চাদের মতই হয়ে যায়।

শিশুর হাঁপানির প্রতিরোধ 

অর্ধেক বা তার বেশি সংখ্যক বাচ্চাদের দেখা যায় হাঁপানি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেরে যায়। যাদের ক্ষেত্রে রোগটি বাড়াবাড়ি রকমের আছে, বড় হওয়ার পরেও তাদের এই রোগটি থেকে যাওয়ারই সম্ভাবনা। সাধারনত, রোগের প্রকোপ থেকে যাওয়ার এবং পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে আছে ধূমপান, কম বয়সে হাঁপানি হওয়া এবং বাড়ির ধূলিকণায় সংবেদনশীলতা। 

যদি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে উদ্দীপক পদার্থ এড়াতে পারলে হাঁপানির বাড়াবাড়ি আটকানো যায়। অ্যালার্জি থাকা বাচ্চাদের অভিভাবককে সাধারণত পালকের বালিশ, কার্পেট, ঝালর লাগানো জামাকাপড়, ধুলোপড়া আসবাবপত্র, তুলো ভর্তি খেলনা এবং যে সব জায়গায় ধুলো হতে পারে সেগুলো একদম বর্জন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। 

যে বাচ্চার হাঁপানি আছে, পরোক্ষ ধূমপান প্রায়শই তার লক্ষণগুলি আরও প্রকট করে তোলে। তাই যে এলাকায় শিশুটি সময় কাটায়, সেখানে অবশ্যই ধূমপান করা বন্ধ করা দরকার। যদি কোনও একটি বিশেষ অ্যালারজেন এড়ানো সম্ভব না হয়,আবার ডাক্তার অ্যালার্জি প্রতিরোধকারী ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুটির ওটির প্রতি সংবেদনশীলতা কম করাতে পারেন, যদিও হাঁপানিতে এর উপকারিতার কথা খুব একটা ভালো আমাদের জানা নেই। 

যেহেতু ব্যায়াম একটি বাচ্চার বিকাশের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই ডাক্তারা সাধারণত বাচ্চাদের শারীরিক কাজকর্ম, শরীরচর্চা এবং খেলাধূলায় অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন এবং শরীরচর্চার আগে হাঁপানির ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে থাকেন।

Leave a reply