শিশুর ত্বকে এলার্জি হলে করণীয় কি ?

শিশুর ত্বকে এলার্জি হলে করণীয়

এলার্জি কি ?

এলার্জি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন এমন লোকের সংখ্যা খুবই রয়েছে। কিন্তু এলার্জি কিভাবে হয় এই ব্যাপারে হয়তো সবার সঠিক ধারণা নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সংস্পর্শে আসা কিছু জিনিসের প্রতি যখন আমাদের দেহে হঠাৎ করে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে ওঠে তখনই সাধারনত এলার্জির সৃষ্টি হয়ে থাকে। প্রতিটি মানবদেহে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম থাকে। কোনো কারণে যদি এই ইমিউন সিস্টেমে গোলযোগ দেখা দেয় তখনই এলার্জির বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে। যেমন দেহের বাইরের কোনো পদার্থ যখন দেহের ভিতর প্রবেশ করে থাকে তখন দেহের ভিতরকার প্রতিরোধক শক্তি তার সঙ্গে যুদ্ধ করে। কিন্তু যদি এই প্রতিরোধ শক্তিকে অতিক্রম করে দেহে প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কিছু হয় তখনই তাকে এলার্জি বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। অর্থাৎ দেহের বাইরে থেকে আসা এন্টিজেনের সঙ্গে দেহের ভিতরে থাকা এন্টিবডির সংঘর্ষে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তাকেই এলার্জি বলা হয়।

বিশেষ কিছু রাসায়নিক ও জৈব পদার্থ রয়েছে  যেগুলো আমাদের দেহের সংস্পর্শে আসলে কিংবা দেহের ভিতরে চলে গেলে দেহের কোনো কোনো অংশ হঠাৎ করে ফুলে যেতে পারে। এতে হাঁচিকাশি হতে পারে, শ্বাসকষ্টও হতে পারে। আর এসকল উপসর্গই এলার্জির কারণে হয়ে থাকে। বিভিন্ন কারণেই এলার্জি হতে পারে। আর এরমধ্যে প্রাকৃতিক কারণটি অন্যতম। যেমন কারো দেখা যায় ঠান্ডায় এলার্জির উপসর্গ হয়ে থাকে। একে বলা হয় কোল্ড এলার্জি। অন্যদিকে দেখা যায় আবার গরমেও কারো কারো এলার্জি হতে পারে। ঘরি বেল্ট, ইমিটেশন, মোজা, গয়না, রাসায়নিক দ্রব্য, ফুলের রেণু, গাছপালা, পোষা জীবজন্তু, তুলার আঁশ, বিভিন্ন খাবার, ওষুধ; এক কথায় হাজারো রকম কারণ ও উপাদান থাকতে পারে যার ফলে  সংবেদনশীল দেহ ও ত্বকে  এলার্জির সৃষ্টি হতে পারে। এলার্জির যেমন বিভিন্ন কারণ রয়েছে তেমনি আবার এলার্জির বিভিন্ন ধরণও রয়েছে। বিশেষ কিছু ধরনের খাবার, নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুলের রেণু, ধূলোবালি, তুলার আঁশ, পোষা জীবজন্তুর লোম দেহে প্রবেশ করে, ধাতুর সৃষ্ট কোনো গয়নাগাটির অলংকার ব্যবহারে, বিভিন্ন ধরনের প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহারে ত্বকের এলার্জির সৃষ্টি হতে পারে সহজেই। আর ত্বকে যে সকল এলার্জিজনিত রোগ দেখা দিয়ে থাকে সেগুলো হচ্ছে আমবাত বা আর্টিকারিয়া, একজিমা, সংস্পর্শজনিত একজিমা ইত্যাদি। প্রথমেই তাহলে আমবাত নিয়ে আলোচনা করা যাক।

শরীরের সকল এলার্জিজনিত রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কমন যে এলার্জি রোগ রয়েছে তার নাম হচ্ছে আমবাত বা ডাক্তারিক পরিভাষায় যাকে বলে আর্টিকারিয়া

এলার্জির লক্ষণগুলো

হঠাৎ করে শরীরের চুলকানিযুক্ত লাগবে, চাকা দেখা দেবে বিভিন্ন মাপের ও বিভিন্ন আকৃতির। আর চাকাগুলো ছোট ছোট গোলাকৃতি থেকে বড় বড় অসমাকৃতির মতো দেখা দিতে পারে। চাকাগুলো শরীরের কিছু কিছু অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে আবার হয়তো বা এটি  শরীরব্যাপীও দেখা দিতে পারে। এই চাকাগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যেই চিকিৎসা ছাড়াই মিলিয়ে যেতে পারে অথবা তা ২৪ ঘণ্টাও লাগতে পারে মিলিয়ে যেতে। এই চাকাগুলোর সংখ্যা আক্রমণের তীব্রতার ওপর এবং প্রতিবারে আক্রমণের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। এলার্জি আক্রমণের সময় সাথে মাথাব্যথা, বমিভাব অথবা বমি ও পেটে ব্যথাও মত সমস্যা থাকতে পারে। যদিও এটা প্রাপ্তবয়স্কদের বেলায় সঙ্গে কোনো জ্বর থাকে না কিন্তু দেখা যায় শিশুদের বেলায় তীব্র আক্রমণের সময় জ্বর একত্রে থাকতে পারে। তাছাড়া এনজিও ইডিমা নামক এই ধরনের তীব্র রোগের সৃষ্টি করতে পারে এটা যেখানে চাকাগুলো বা আক্রান্ত এলাকাগুলোর আকৃতি তুলনামূলকভাবে বেশ বড় ধরনের হতে পারে এবং এক থেকে সাতদিনের মতো সময় লাগতে পারে সম্পূর্ণ চলে যেতে এবং ফোলাগুলো ত্বকের বেশ নিচে চর্বিস্তরে সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং সাধারণত কোনো চুলকানি থাকে না। সাধারনত, একটা অথবা কিছু আক্রান্ত এলাকা মুখম-লে সৃষ্টি হতে পারে-বাহুতে এবং কম সংখ্যক ক্ষেত্রে শরীরের অন্যান্য এলাকায় দেখা দিতে পারে। যদি ঠোঁটে বা জিহ্বায় আক্রান্ত হয় তাহলে গলার ভিতরে স্বরযন্ত্রে বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধার সৃষ্টি এবং পরিণামে মৃত্যু ঝুঁকির সম্ভাবনাও অনেক রয়েছে। এ সকল ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এখন যে সকল এন্টিজেন আমবাত অথবা আরো তীব্র অবস্থা এই এনজিও ইডিমার সৃষ্টি করতে পারে সেগুলো হচ্ছে:

খাবার : যেসব খাবারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমিষ পদার্থ থাকে যেমন গোশত, মাছ, ডিম, দুধ, গম, চাল, বাদাম, আলু ইত্যাদি খাবার গ্রহণের ফলে আমবাতের সৃষ্টি হতে পারে। খাবারে সৃষ্ট অ্যালার্জি আমবাত নির্দিষ্ট খাবারের কারণে অথবা কত বেশি খাবার গ্রহণ করা হয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করবে যে, এই অ্যালার্জি প্রতি খাবারের পরেই দেখা দেবে, না এটি কোনো একবার গ্রহণ করলেই দেখা দেবে। তাছাড়া সারাদিনে কয়েকবার আক্রমণ ঘটবে না কয়েকদিনে একবারে ঘটবে ইত্যাদি। কখনো রান্নার মসলা অথবা খাবারের সঙ্গে যে সকল অতিরিক্ত উপাদান মিশ্রিত করা হয় সেগুলো গ্রহণের ফলেও এই আমবাত সৃষ্টি হতে পারে। খাবার গ্রহণ ও আমবাত সৃষ্টি হওয়ার সময় খাবার হজমের ও পরিশোষণের সময়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে এটা কয়েক মিনিটও হতে পারে আবার কয়েক ঘন্টাও হতে পারে। যাই হোক আমবাত খাবার বন্ধ করার ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে তবে এই পুনরায় একই খাবার গ্রহণ করলে আবার দেখা দেবে।

ওষুধ : কিছু কিছু ওষুধ যেমন পেনিসিলিন, সালফোনামাইড, টেট্রাসাইক্লিন ইত্যাদির ব্যবহারে আমবাত সৃষ্টি হতে পারে সহজেই। ওষুধ ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট আমবাত ক্ষণস্থায়ী এবং ওষুধ ব্যবহার বন্ধের পর এইগুলো অতি শীঘ্রই চলে যায়। কিন্তু পেনিসিলিন ও স্যালিসাইলেট ওষুধ ব্যবহারে সৃষ্ট আমবাত ওষুধ বন্ধ করার কয়েক সপ্তাহ পর পর্যন্তও শরীরে থাকতে পারে।

নিঃশ্বাসের মাধ্যমে : পরাগরেণু, ছত্রাকের ডিমজাতীয় কীট-পতঙ্গের ভগ্নাংশ এবং মানব ও পশুর মলের মত এমন অনেক পদার্থ আছে যা বাতাস ও ধূলোবালিতে মিশে থাকতে পারে এবং যেগুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় কারো কারো ক্ষেত্রে আমবাত সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যাদের এগুলোর প্রতি এলার্জি রয়েছে। কীটপতঙ্গের সৃষ্ট আমবাত থাকতে পারে কিন্তু পরাগরেণু, ছত্রাকডিম ঋতু নির্ভর করে। তাছাড়া এই শূন্যে ভাসমান পরাগরেণুর একস্থান থেকে অন্য স্থানে পার্থক্য রয়েছে। তাই দেখা যায় কেউ একস্থানে আক্রান্ত হলে আবার অন্য কোনো স্থানে এটি ভালো হয়ে যায়। এমনকি দেখা যায় ২/৩ দিনের জন্য অন্য কোথাও গেলে ভালো হয়ে যেতে পারে।

ইনফেকশন : আমবাত হওয়ার জন্য ইনফেকশনও একটি অন্যতম কারণ হিসেবে পরিচিত। তবে এসব ক্ষেত্রে ইনফেকশন কন্ট্রোল হয়ে গেলে আমবাত ঠিক যাবে। কখনো কখনো শরীরে ইনফেকশন সুপ্ত ও লুপ্ত অবস্থায় থেকে রক্তে এন্টিজেন নির্গত করছে এবং তা অ্যালার্জির সৃষ্টির করে যাচ্ছে। যেমন টনসিল, দাঁত, কান, গলা, সাইনাস, হাড়, কিডনি পিত্তথলিতে ইনফেকশন সুপ্ত অবস্থায় থাকে কিন্তু এটা শরীরে তেমন লক্ষণাদি দেখা দেয় না। এলার্জি ইনফেকশনের কারণে হয় কিনা তা বুঝা যাবে যদি এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে কিংবা সুপ্ত স্থানগুলোর মধ্যে অপারেশনের পর আমবাত ভালো হয়ে যায়।

অন্ত্রে বা পেটে কৃমি বা পরজীবী থাকলে : অনেক পরজীবীই অন্ত্রে বাস করে এবং এগুলো তাদের শূককীট অবস্থায় ত্বকের মাধ্যমে বা ফুসফুসের মাধ্যমে পথ অতিক্রম করে থাকে এবং অ্যালার্জির সৃষ্টি করতে পারে। এটি আবার, ইরিনের আমবাত অবশ্য কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে।

ঠাণ্ডা : সাধারনত ঠাণ্ডার ফলেও অ্যালার্জির সৃষ্টি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের রোগের সাথে অন্য কিছু রোগ থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো রোগ ব্যতীত সুস্থ লোকের ক্ষেত্রেও ঠাণ্ডাজনিত অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে সহজেই। এ ধরনের রোগীদের বেলায় ঠাণ্ডা পানিতে গোসল, ঠাণ্ডা পানিতে হাত ধোওয়া, ঠাণ্ডা বাতাসে বের হওয়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে ঢোকার ফলে এমনকি ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা খাবার বের করতে গেলে এই ধরনের কারনের জন্য অ্যালার্জির শিকার হতে হয়। বরফ পানি, ঠাণ্ডা খাবার এমনকি ঠাণ্ডা কিছু কিছু বস্তু ধরতে গেলেও এই ধরনের অ্যালার্জি শিকার হতে পারে।

গরম : কারো কারো ক্ষেত্রে আবার গরম এলার্জিও হতে পারে। বিশেষ করে রান্নাঘরে, উত্তাপে, ওভেন, স্টোভ, রুমহিটার এমনকি রোদে বের হলে দেখা দিতে পারে। আর সূর্যরশ্মির ফলে সৃষ্ট এলার্জি শুধুমাত্র শরীরের অনাবৃত অংশগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

মানসিক অস্থিরতা : দেখা যায় কখনো কখনো মানসিক আবেগপ্রবণতার ফলেও শরীরে আমবাতের এলার্জি সৃষ্টি হতে পারে।

প্রেসার : দীর্ঘস্থায়ী প্রেসার যেমন আটশাট বেল্ট, মোজার ইলাস্টিক ব্যান্ড, শক্ত স্থানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, আবার বসে থাকার ফলে, ঘড়ির বা ব্রেসিয়ারে স্ট্র্যাপ ব্যবহারের ফলেও এ ধরনের এলার্জির সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের এলার্জিতে শরীরের যে এলাকাতে চাপ পড়ছে সে এলাকায় এবং এই চাপ কয়েক ঘন্টা যাবত হতে হবে তা না হলেও হয়তো এই এলার্জি সৃষ্টি নাও হতে পারে। উপরোল্লিখিত কমন কারণগুলো ছাড়াও আরো অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে যেগুলোর মধ্যে ভাইরাস, ছত্রাক, ক্যান্সার, শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা খর্বকারী রোগসমূহ অন্যতম রয়েছে।

চিকিৎসা ও প্রতিকার

আমবাতজনিত অ্যালার্জি সৃষ্টি হলে এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ প্রয়োগের ফলে আমবাত নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটাই সম্ভব। যদি হালকা মাত্রার হয় তাহলে শুধু মুখে খাওয়ার ওষুধই যথেষ্ট আর যদি তীব্র হয় তাহলে অবশ্যই খাওয়ার ওষুধের সাথে ইনজেকশনও ব্যবহার করতে হতে পারে। যদি ঠোঁট ফুলে যায় ও এনজিও ইডিমার লক্ষণ দেখা যায় তাহলে ত্বকের নিচে এড্রিনালির ইনজেকশন পুশ করতে হয় অবশ্যই। তবে আমবাতের চিকিৎসায় এন্টিহিস্টামিনের ব্যবহার করা সাময়িক। যে কারণে আমবাত সৃষ্টি হচ্ছে তার ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে দেখা যাবে যে ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করার পর এটি আবারো এলার্জি দেখা যাচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানের জন্য যদি সন্দেহ করা হয় যে খাবারের কারণে আমবাত হচ্ছে তাহলে সেই নির্দিষ্ট খাবার ত্বকের নিচে এই ইনজেকশন দিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পরাগরেণু, ছত্রাকডিম, কীটপতঙ্গের ভগ্নাংশ একক পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা অনেকটাই সম্ভব। পরজীবীর উপস্থিতি মল পরীক্ষার মাধ্যমে, শরীরের ইনফেকশনের জন্য উক্ত এলাকা কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নির্ণয় করা যায়।এই এলার্জি ত্বকে বরফ স্পর্শ করার মাধ্যমেও নির্ণয় করা যেতে পারে। আসলে চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণ ও উৎস সৃষ্টি বের করে তারপর এটির প্রতিকারের মাধ্যমে করা উচিত। যে খাবার বা যেসকল কারণে বা যার সংস্পর্শে আমবাত হতে পারে তা বর্জন করা ভালো।আবার বরা যায় প্রতিকারের জন্য আরেকটি ব্যবস্থা হচ্ছে রোগীকে বিশেষ বস্তু বা খাবারের প্রতি তার সংবেদনশীলতা কমিয়ে আনা, যাকে কিনা ডিসেনসিটাইজেশন প্রক্রিয়া বলা হয়ে থাকে আর এগুলো বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করতে হয়।

Leave a reply