গর্ভাবস্থায় কী খাবেন আর কী বাদ দেবেন?

প্রত্যেকটি গর্ভবতী মহিলা চান সুস্থ-সবল সন্তানের জন্ম দিতে। গর্ভজাত সন্তান যাতে ভালো থাকে তাই গর্ভাবস্থায় মহিলারা সবকিছুতেই বাড়তি যত্ন নিয়ে থাকেন । বিশেষ করে খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, শিশুর পুষ্টির জন্য কোন খাবার খাওয়া দরকার ও কোন খাবার গর্ভবতী মায়ের শরীরে পুষ্টির চাহিদা মেটাবে।
গর্ভাবস্থায় কী খাবেন আর কী বাদ দেবেন

গর্ভবতী মায়েরা যে খাবার খাবেন

১। ফল ও শাকসবজি দিনে ৫ বার ফল ও ৭ বার সবজি খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ফলের চেয়ে শাকসবজি বেশি খেতে হবে। আবার, জুস ও স্মুদি ও পান করতে পারেন। তবে এগুলোর সুগার আপনার ব্লাড সুগার লেভেল বৃদ্ধি করতে পারে এবং দাঁতেরও ক্ষতি করতে পারে। তাই এগুলো সীমিত পরিমাণে পান করাই বেশি ভালো। তাজা ফল ও সবজি খাওয়াই বেশি স্বাস্থ্যকর শরীরের জন্য। 

২। স্টার্চ জাতীয় খাবার আলু, লাল চালের ভাত, রুটি, পাস্তা ইত্যাদি স্টার্চ জাতীয় খাবার আপনার প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় অবশ্যই রাখুন। শর্করা জাতীয় খাবার শরীরে এনার্জি প্রদানে সাহায্য করে থাকে। 

৩। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার চর্বিহীন মাংস, মুরগী, মাছ, ডিম, ডাল (মটরশুঁটি, মসূর ডাল) ইত্যাদি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। অবশ্যই, সপ্তাহে ২ দিন বা তারচেয়েও বেশি মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন। আবার, সারডিন, স্যামন এর মত তৈলাক্ত মাছ বা সামুদ্রিক মাছ সপ্তাহে ১ দিন খেতে পারেন। আমিষ জাতীয় খাবার গর্ভের শিশুর শরীরের নতুন টিস্যু গঠনের জন্য অনেক সাহায্য করে। 

৪। দুগ্ধজাত খাবার দুধ, পনির, দই ইত্যাদি খাবারগুলো ক্যালসিয়ামের চমৎকার একটি উৎস। এগুলোর চিনি ও ফ্যাটের পরিমাণ যেন কম থাকে সেটি অবশ্যই খেয়াল করতে হবে। ফ্যাট জাতীয় খাবার শিশুর মস্তিষ্কের কোষ গঠনে সাহায্য করে থাকে। অনেক সময় মানুষের শরীরেই আয়োডিনের ঘাটতি থাকে। আয়োডিন এমন একটি খনিজ উপাদান যা শিশুর মস্তিষ্কের গঠনের জন্য অপরিহার্য হিসেবে পরিচিত। দুগ্ধজাত খাবার ও সামুদ্রিক খাবার আয়োডিনের চমৎকার উৎস বলা যায়। এটি গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর অনেক বেশি কাজ করে। তবে সাধারণত প্রথম ৬ মাসে বাড়তি কোন ক্যালোরির প্রয়োজন হয়না। সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে যখনই আপনার ক্ষুধাবোধ হবে তখনই খাবেন। 

গর্ভবতী মায়ের নিষিদ্ধ খাবার

১। কাঁচা ডিম  পুষ্টিকর একটি খাবার। অনেকেরই এই কাঁচা ডিম খাওয়ার অভ্যাস থাকে। কিন্তু গর্ভাবস্থায় কাঁচা ডিম খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবেই। কারণ এই কাঁচা ডিমে সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাই অবশ্যই ডিম ভালোভাবে সিদ্ধ না করে খাওয়া যাবেনা। 

২। অর্ধসিদ্ধ মাংস অর্ধসিদ্ধ মাংসের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। প্যাকেটজাত মাংস যেমন- সসেজ খাওয়া থেকেও আপনার বিরত থাকতে হবে। আর মাংস ভালো ভাবে সিদ্ধ করে রান্না করতে হবে। 

৩। অপাস্তুরিত দুধ অপাস্তুরিত দুধ বা কাঁচা দুধের মধ্যে লিস্টেরিয়া নামক ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাই ভালো করে না ফুটিয়ে দুধ পান করা একদম যাবেনা। অপাস্তুরিত দুধ দিয়ে তৈরি খাবার যেমন- নরম পনির খাওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। 

৪। কলিজা ও কলিজার তৈরি খাবার লিভারে রেটিনল থাকে যা একটি প্রাণীজ ভিটামিন এ বলা যায়। এর অতিরিক্ততা গর্ভের শিশুর জন্য অনেক ক্ষতিকর হতে পারে। 

৫। আবার, ক্যাফেইন কফি ক্লান্তি দূর করার জন্য কার্যকর হলেও গর্ভাবস্থায় এর পরিমাণ কম করতে হবে। চা, কফি  ইত্যাদির মধ্যে ক্যাফেইন থাকে। দৈনিক ২০০ গ্রামের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করা একদম ঠিক নয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের ফলে দেখা যায় কম ওজনের শিশু জন্ম গ্রহণ করে। মিসক্যারেজের মত ঘটনাও ঘটতে পারে এর ফলে। 

৬। সামুদ্রিক মাছ সামুদ্রিক মাছ স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। কিন্তু অধিক পরিমাণে খেলে গর্ভের শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয়ে থাকে। কারণ সামুদ্রিক মাছের মধ্যে পারদ জাতীয় পদার্থ থাকে। 

৭। কাঁচা বা আধা পাকা পেঁপে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কাঁচা বা আধা পাকা পেঁপে খাওয়া খুবই বিপদজনক। এতে দেখা যায় গর্ভপাতের মত ঘটনা ঘটতে পারে। Harvard School of Public Health প্রেগনেন্ট নারীদের জন্য হার্ভার্ড হেলথি ইটিং প্লেট নামে নির্দেশিকা এটি প্রকাশ করেছে। যেখানে তারা আস্ত শস্যদানার খাবার খাওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। আবার স্বাস্থ্যকর ভেজিটেবল ওয়েল গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার সীমিত পরিমাণে অর্থাৎ দিনে ১/২ বার খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে বলা হয়। লাল মাংস সীমিত পরিমাণে এবং প্রসেসড মিট এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রিফাইন্ড শস্য দিয়ে তৈরি সাদা পাউরুটি ও সাদা চালের ভাত এড়িয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার কথাএ বলা হয়েছে এবং চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। 

গর্ভাবস্থায় নারীদের খাবারের আদর্শ খাবার তালিকা

আমরা উদাহরণসরূপ কিছু আদর্শ খাদ্য রুটিনের কথা বলব। তবে আপনার বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওজন ইত্যাদি বিবেচনা করে ভাল ডায়েট সাজেশন অবশ্যই আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিবেন। 

গর্ভবতী মায়ের সকালের খাবার তালিকা 

সকালে অনেক গর্ভবতী নারীরই প্রায় বমি বমি ভাব হয় এবং খেতে ইচ্ছে করেনা। সেক্ষেত্রে গর্ভবতী ভারী খাবার না খেয়ে হালকা চা (গ্রিনটি)ও বিস্কিট খেয়ে নিতে পারেন। এর বেশ খানিকটা পরেই মাত্র ২ টি রুটি ও সবজি খেতে পারেন। সাথে একটি ডিম সিদ্ধ করে খাওয়া অনেক ভালো। এরপর বেলা ১০ টা/ ১১ টায় ১ গ্লাস ননী ছাড়া দুধ বা ফল বা ফলের জুস ও বাদাম খেতে পারেন। 

গর্ভবতী মায়ের দুপুরের খাবার তালিকা 

দুপুরে ১ বাটি ভাতের সাথে মাছ বা মাংস, সবজির তরকারী, শাক, ডাল এবং তাজা ফল ও সবজির সালাদ ইত্যাদি। আর খাওয়ার শেষে খেতে পারেন দই। বিকালে – ভাঁজা-পোড়া খাবার না খেয়ে ঘরে তৈরি কোন স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স বা কেক বা বাদাম বা মটরশুঁটি সিদ্ধ করে খেতে পারেন। আবার, ফল বা ১ গ্লাস ফলের জুস খেতে পারেন। 

গর্ভবতী মায়ের রাতের খাবার তালিকা 

রাতের খাবারটা দুপুরের মতোই হবে। তবে শাক রাতে না খাওয়াই বেশি ভালো। বেশি বেশি করে সবজির তরকারী খেতে পারেন। এবার, ঘুমাতে যাওয়ার আগে ১ গ্লাস ননী মুক্ত দুধ পান করতে ভুলবেন না। যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্ত চাপের মত সমস্যা আছে তারা ডাক্তারের দেয়া তালিকা অনুযায়ী অবশ্যই খাবার খাবেন। ডায়েবেটিসের রোগীরা শর্করা ও মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে যেতে হবে এবং ব্লাড প্রেশারের রুগীদের লবণ খেতে হবে কম করে একদম।

Leave a reply