গর্ভবতী মায়ের খাবার ও পুষ্টি

গর্ভবতী মায়ের খাবার ও পুষ্টি

গর্ভবতী মায়ের খাবার ও পুষ্টি গর্ভের সন্তান পুষ্টি পায় মূলত তার মায়ের কাছ থেকে। অনাগত সন্তান আর মায়ের ভবিষ্যৎ সুস্থতাও অনেক ক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের খাবার কেমন তার ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করে। অনেক মা এই দ্বিধায় ভোগেন কী খাওয়া উচিত, কী উচিত নয়। অনেকে উদ্বিগ্ন থাকেন আবার বাড়তি ওজন নিয়েও। বহু মানুষের ধারণা, মা যদি বেশি খাবার খায় তাহলে তার গর্ভের সন্তান আকারে বড় হবে। তখন আবার স্বাভাবিক ডেলিভারি সম্ভব হবে না। এজন্য গর্ভবতী মাকে কম খেতে দেওয়া হয়। যা মা ও শিশুর উভয়ের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে। আবার অনেকের মতে, একজন গর্ভবতী মাকে অবশ্যই দুজনের খাবার খাওয়া উচিত। এটাও একদম ঠিক নয়। কারণ অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের সঙ্গে আবার মুটিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে। অতিরিক্ত ওজনের মায়েদের ক্ষেত্রে মৃত সন্তান অথবা ছোট শিশুর জন্মদানের ঘটনা বেশি ঘটে। 

তবে খাবার যেমনই হোক না কেন, সেটা হতে হবে অবশ্যই পুষ্টিকর। এ জন্য একজন গর্ভবতী মায়ের খাবারে খাদ্যের সব কয়টি উপাদানের উপস্থিতি থাকতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি নারীর দৈনিক ২১শ’ ৬০ কিলো- ক্যালরি খাদ্যের প্রয়োজন হলেও একজন গর্ভবতীর প্রয়োজন হয় তার চেয়ে ৩৫০ কিলো ক্যালরি খাদ্যের মত। তা না হলে শিশু অপুষ্টিতে ভুগে ও কম ওজন নিয়ে শিশু জন্ম নেয়। একজন গর্ভবতী মায়ের খাবার এবং কোন খাবার গর্ভের সন্তান এবং মায়ের জন্য প্রয়োজন তা নিচে আলোচনা করা হলো- 

প্রোটিন বা আমিষ প্রোটিন শরীরের গঠন ও বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে৷ গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রোটিনে চাহিদা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে একটু বেশি হয়৷ আমিষ গর্ভের শিশুর শরীরের নতুন টিস্যু তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। একজন গর্ভবতী মাকে দৈনিক অন্তত ৬০ গ্রাম আমিষ জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। প্রতিদিনের আমিষের অভাব পূরণে জন্য ২ থেকে ৩ টুকরো মাছ, ৩ থেকে ৪ টুকরো মাংস ও কমপক্ষে একটি ডিম খেতে হবে। এছাড়া নিয়ম করে প্রতিদিন অবশ্যই একগ্লাস উষ্ণ গরম দুধ পান করতে হবে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় trimester-এ প্রতিদিন যথাক্রমে ১, ৯ ও ৩১ গ্রাম অতিরিক্ত প্রোটিন প্রয়োজন হয়ে থাকে।তবে খেয়াল রাখতে হবে যে কাঁচা বা আধা সিদ্ধ মাংস খাওয়া যাবে না এবং ডিম ভাল করে সিদ্ধ করে বা ভেজে খেতে হবে।আর দুধ ভাল মতো ফুটিয়ে পান করা উচিত। ক্যালসিয়াম গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে৷আবার, গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে শিশুর হাড় ও দাঁতের গঠনের জন্য অনেক ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হয়৷ যদিও গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় তুলনামূলকভাবে ক্যালসিয়ামের চাহিদা বেড়ে যায়, তবুও এই শেষের ৩ মাস চাহিদাটা সবচেয়ে বেশি থাকে। 

WHO এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের দিনে ১০০০ মিলিগ্রাম এবং বিশেষ করে শেষ ৩ মাসের প্রতিদিন ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া খুব দরকার। দুধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য, মাছ, বাদাম, কমলালেবু, শুকনো ফল, সবুজ পাতাসহ শাক-সবজি, ফুলকপি ও তৈলবীজ খাবারে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে৷ আর আয়রন আমাদের দেশের বেশির ভাগ গর্ভবতী মহিলাই রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকেন৷ আবার,গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়৷ আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন ও এনার্জি তৈরিতে সাহায্য করে, গর্ভস্থ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্নায়ুতন্ত্র বিকাশ করে থাকে।

Institute Of Medicine (IOM) এর মতে, গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ২৭ মিলিগ্রাম আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া খুব দরকার।এই সময় যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন গ্রহণ করা না যায় তাহলে তার এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে৷ তাই রক্ত স্বল্পতা প্রতিরোধ করার জন্য মাকে অবশ্যই আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে৷ গরু কিংবা খাসির কলিজা, বাচ্চা মুরগি, ডিম, মাছ, কলা, কচুশাক, পালং শাক এ সবের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আয়রন রয়েছে৷

ফলিক এ্যাসিড কোষ বিভাজনে ফলিক এ্যাসিডের বড় ধরণের ভূমিকা থাকার কারণে গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমাণে ফলিক এ্যাসিড দরকার হয়৷ ফলিক এ্যাসিড শিশুর মেরুদন্ড গঠনে সহায়তা করে থাকে৷ কোন কারণে ফলিক এ্যাসিডের অভাব হলে একটি শিশুর মেরুদণ্ডে জণ্মগত ত্রুটি থাকতে পারে৷ গর্ভবতী মায়ের শরীরে ফলিক এসিডের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ না হলে গর্ভস্থ শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না এবং জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যায়। খেয়াল রাখতে হবে যেন গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহ ফলিক এসিডের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। কারণ বিশেষ করে সেই সময়টিতে গর্ভবতী মায়ের শরীরে ফলিক এসিডের অভাব হলে গর্ভস্থভশিশুর উপর এর প্রভাব পড়ে থাকে।

IMO এর মতে, একজন গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। সাধারনত,ফলিক এসিডযুক্ত খাবারের মাঝে রয়েছে ব্রোকলি, ভাত, মসুর ডাল, কমলার জুস, পালং শাক ও পাউরুটি। ভিটামিন-এ হাড় ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহের গঠনের জন্য ভিটামিন এ প্রয়োজন অপরিসীম৷ গর্ভস্থ শিশুর প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বেড়ে ওঠা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর থাকা, দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করা এবং সার্বিকভাবে বেড়ে ওঠায় ‘ভিটামিন এ’ প্রয়োজন রয়েছে। গর্ভে থাকা শিশু যেহেতু সব পুষ্টি মায়ের মাধ্যমেই পায়, তাই গর্ভবতী মায়ের শরীরে ভিটামিন এ-এর এই চাহিদা পূরণ হওয়া দরকার অনেক। 

WHO-এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ৮০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই খাওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে খাবারের তালিকায় থাকা চাই মুরগির কলিজা, ডিম, গাজর, আম, গাঢ় কমলা ও হলুদ রঙের ফল এবং গাঢ় সবুজ রঙের শাক-সবজি ইত্যাদি। ভিটামিন বি-১, বি-২ ও নায়াসিন: ভিটামিন-বি পরিবারভুক্ত ৬টি ভিটামিনের মধ্যে গর্ভাবস্থায় চাহিদা বেড়ে যায় ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিন, বি-২ বা রিবোফ্লাবিন ও বি-৩ বা নায়াসিনের এগুলোতে। আবার বি-ভিটামিন ডায়জেস্টিভ সিস্টেমকে চালু রাখে। আবার ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে।এর পাশাপাশি চামড়ার শুষ্কভাব কমিয়ে সতেজ রাখে।

গর্ভাবস্থায় যেহেতু হরমোনের পরিবর্তনের কারণে পেট, কোমর, গলা-এসব জায়গার চামড়ার রং পরিবর্তন হয়, পেটের চামড়া স্ফিত হওয়ায় টান লাগে, তাই বি-ভিটামিন এই সময় চামড়ার দেখভালে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার ‘রেড মিট’, কলিজা, ডিম, কলা, কিডনি, বিনস, পালংশাক, কাঠবাদাম ও দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি পাওয়া যায়। ভিটামিন-সি ভিটামিন সি এর সাহায্যে শরীর সহজেই শাকসবজি থেকে আয়রন শোষণ করে নিতে পারে, রক্তশূন্যতার সম্ভাবনা কমায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে থাকে।এ জন্য ডাক্তার বা পুষ্টিবিদেরা আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরপরই লেবু, কমলা, বাতাবিলেবু বা আমলকী খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে যে ভ্রূণের মানসিক বৃদ্ধিতে ভিটামিন-সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।আবার ভিটামিন-সি ফলিক অ্যাসিডকে কার্যকর করে তোলার চালিকাশক্তি।গর্ভের শিশুর মাংসপেশি ও হাড় গঠনের কোলাজেন প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। এতে ভিটামিন-সি কোলাজেন তৈরিতেও সাহায্য করে।

IOM এর মতে, একজন গর্ভবতী মায়ের দিনে অবশ্যই ৮৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। আবার ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন – আমলকী, পেয়ারা, কমলা লেবু, বাতাবি লেবু, সবুজ শাক-সবজি, টমেটো এবং আলু খেতে হবে৷ এটা মনে রাখবেন বেশিক্ষণ রান্না করলে ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়৷ ভিটামিন-ই  রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে৷ আপেল, বাদাম, গাজর, বাঁধাকপি, ডিম, অলিভ তেল ও ও সূর্যমুখি বীজ এগুলোতে ভিটামিন ই পাওয়া যায়৷ জিংক গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস জিংক এবং ফলিক এ্যাসিডের ভূমিকা অপরিসীম বলা যায়৷আর জিংক গর্ভপাত প্রতিরোধ করে এবং শিশুর ওজন বাড়ায়৷ জিংক শরীরের প্রত্যেকটি অংশের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্ষমতা সক্রিয় রাখে এবং টিস্যু ও কোষ গঠনের জন্য ভূমিকা রাখে। এমনকি গর্ভে থাকা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বেড়ে ওঠায় জিংক গুরুত্বপূর্ণ বলা যায় ।

WHO এর মতে, গর্ভাবস্থায় প্রথম ৩ মাস ১১ মিলিগ্রাম, দ্বিতীয় ৩ মাস ১৪ মিলিগ্রাম ও শেষের ৩ মাস ২০ মিলিগ্রাম করে জিংক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া খুবই দরকার। আর এই জিংক পাওয়া যাবে প্রানিজ প্রোটিনে৷ তাছাড়াও চিনে বাদাম, মিষ্টি কুমড়ার বীজ, গম এসবে প্রচুর পরিমাণ জিংক থাকে যা আপনার গর্ভাবস্থায় চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়৷ আয়োডিন গর্ভাবস্থায় আয়োডিনের অভাব হলে গর্ভে থাকা সময় থেকে শুরু করে জন্মের ৩ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর বুদ্ধির বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। এছাড়াও আয়োডিনের অভাবে গর্ভে থাকা শিশুর মৃত্যুর সম্ভাবনাও অনেক থাকে। এটি থাইরয়েডকেও অনেক সুস্থ রাখে। তাই WHO গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম আয়োডিনযুক্ত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।আর আয়োডিন যুক্ত খাবারের মাঝে আছে আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, পনির, টক দই, গরুর দুধ ইত্যাদি । 

আর Docosahexaenoic Acid (DHA) DHA হলো ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডগুলোর মধ্যে একটি। এটি গর্ভে থাকা শিশুর দৃষ্টিশক্তি ও রক্ত কোষ বিকাশের সহায়ক করে তুলে । বিশেষ করে শেষের ৩ মাস DHA গর্ভে থাকা শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে কাজ করে থাকে। তাই গর্ভবতী মায়ের DHA সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া বেশ প্রয়োজন হয়। একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রাম এমন খাবার খাওয়া দরকার যাতে আছে DHA । সামুদ্রিক মাছ ও ডিমে পাওয়া যাবে এই DHA।পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরে ফ্লুইডের সঠিক ব্যালেন্স বজায় রাখে হার্টবিট ও এনার্জি লেভেলকে স্বাভাবিক রাখে এটি। পটাশিয়ামযুক্ত খাবারগুলো হলো মিষ্টি আলু, কিসমিস, ব্রোকলি, টক দই, মসুর ডাল, পালং শাক ও কমলার জুস ইত্যাদি। ভিটামিন ট্যাবলেট গর্ভাবস্থায় শরীরে অতিরিক্ত ভিটামিনের প্রয়োজন হয়ে থাকে৷ এই অতিরিক্ত ভিটামিনের চাহিদা খাবারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব না হলে তা অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হবে৷

আর পানি রোজ প্রচুর পরিমানে পানি পান করতে হবে। পানি শরীরে রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে থাকে । রক্তের মাধ্যমেই বাচ্চার শরীরে পুষ্টি পৌঁছায়। এছাড়া পানি মূত্র থলির প্রদাহ ও অতিরিক্ত ঘাম রোধ করে থাকে।আর পানির সঙ্গে বিভিন্ন সুপ, টাটকা ফলের রসও খাওয়া যেতে পারে

Leave a reply